৩০০ কর্মীকে কোটি টাকা বেতন দেন ২২ বছরের নয়ন

৫০ বছরে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে। তবে, জনসংখ্যা বেড়ে হয়েছে প্রায় তিনগুণ। যা দেশের সম্পদ না হয়ে পরিণত হয়েছে অভিশাপে। বেকারত্ব বেড়েছে, যুবসমাজ ছুটছে চাকরির পেছনে। ঠিক এখানেই সবার থেকে চিন্তা চেতনায় ভিন্ন ‘নয়ন’। তার বয়স এখন ২২। এই স্বল্প বয়সেই গড়েছেন ফ্রিল্যান্সিং প্রতিষ্ঠান ‘ইকম সলিউশন’। যেখানে ৩০০ তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। তার অধীনে কাজ করছেন ২০০ বাংলাদেশী ও ১০০ ফিলিপিনো তরুণ-তরুণী। তার প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মাসিক বেতন প্রায় কোটি টাকা।
শুরুর গল্প সম্পর্কে নয়ন ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা শরীয়তপুরের জাজিরাতে। আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। বাবা কৃষিকাজ আর মা চাকরি করতেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে।

বাবা-মা ও দুই ভাই-বোনকে নিয়ে ছিল আমাদের টানাটানির সংসার। পরিবারের কথা চিন্তা করে যুবক বয়সে স্কুলে পড়ার সময় থেকে টিউশনি শুরু করি। নয়ন জানান, শৈশব থেকেই আমার তথ্য প্রযুক্তি সংক্রান্ত খুঁটিনাটি বিষয়গুলো জানতে অনেক ভালো লাগত। কিছু কাজও শিখেছি নিজ উদ্যোগে। গ্রামে কারো স্মার্টফোন কিংবা কম্পিউটার নষ্ট হয়ে গেলে সেটা খুশি মনে সারিয়ে দিতাম। অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালে অনেকটা শখের বসে কম্পিউটার চালানো শিখি। তিনমাসের প্রশিক্ষণও নিয়েছিলাম। ২০১৪ সালে পাঁচ দিনের ফ্রি প্রশিক্ষণে ফ্রিল্যান্সিং শিখি। এখানেই আমার ফ্রিল্যান্সিং এর হাতেখড়ি হয়।

নয়ন বলেন, আমার স্বপ্ন ছিল বড়। এই বড় স্বপ্ন পূরণে তিন মাসের কম্পিউটার কোর্স যথেষ্ট ছিল না। পাশাপাশি আমার কম্পিউটার না থাকা ও গ্রামের ধীরগতির ইন্টারনেটও বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল। তারপর ২০১৭ সালে আমার এইচএসসি শেষ হলো। প্রবল ইচ্ছাশক্তি নিয়ে চলে আসি ঢাকাতে। ঢাকায় এসে ভর্তি হলাম রাজধানীর সরকারি তিতুমীর কলেজের ইংরেজি বিভাগে। সময়টা ছিল অনেক কঠিন। পরিবারের অসচ্ছলতার কারণে আমাকেই আমার লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করতে হতো। ফলে বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে আমি বাধ্য ছিলাম।’

তিনি বলেন, আমি নিয়মিত ইউটিউবে ফ্রিল্যান্সিং কাজের ভিডিও দেখতাম। আমার ভিডিও দেখার দৃশ্য দেখেন আমার মেসের বড় ভাই ‘অরবিন্দ কুমার রায়’। তখন আমি ভাইয়ের কাছে যেকোনো একটি বিষয়ে দক্ষ হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করি। তার সহায়তায় ১২ হাজার টাকা দিয়ে ওয়েব ডেভেলপমেন্টের কাজ শিখি। শুরু করি ফ্রিল্যান্সিং। নয়ন আরো বলেন, ২০১৯ সালে আমি আমার প্রথম গ্রাহক পাই। প্রথম কাজের বিনিময়ে পেলাম ১০০ ডলার। পাশাপাশি একটি অনলাইন দোকান ব্যবস্থাপনার কাজের প্রস্তাব পাই। আমি রাজি হলাম। পরবর্তীতে একে একে আমার ‘মার্চেন্ট স্টোর’ এর সংখ্যা বাড়তে থাকে। পরবর্তীতে বিশ্বখ্যাত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন ও ওয়ালমার্টের মার্চেন্ট স্টোরের ব্যবস্থাপনায় জড়িয়ে যায়। পরে দুইজন তরুণকে মার্চেন্ট স্টোরের কাজ শেখাই এবং নিজের দলে টানি। এভাবে একে একে আমি শতাধিক তরুণের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি।

তিনি বলেন, তার ইকম সলিউশন প্রতিষ্ঠানে দেশের পাশাপাশি ফিলিপাইনের তরুণদেরও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। তারা মূলত ভিনদেশী ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও গ্রাহকসেবায় কাজ করে। নবীন ফ্রিল্যান্সারদের উদ্দেশ্য তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ই-কর্মাস সাইটগুলোর মার্চেন্ট স্টোর ব্যবস্থাপনার জন্য এবং যোগাযোগের জন্য ইংরেজি ভাষায় দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন হয়। নবীনদের ফ্রিল্যান্সিং এ আসার আগে ইংরেজি ভাষাতে দক্ষ হওয়া প্রয়োজন। ভবিষ্যতে ইকম সলিউশনের জন্য নয়ন একটি অফিস নিতে চান। এবং নিজের প্রতিষ্ঠানে এক হাজার তরুণের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করার ইচ্ছা পোষণ করেন তিনি।

নয়নের এই ভিন্নধর্মী উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. মহিউদ্দিন বলেন, আমি প্রথম যখন তার কথা শুনি, সত্যি অভিভূত হই। বর্তমানে তার মতো উদ্যোগ সব শিক্ষার্থীদের নেওয়া দরকার।

তিনি আরো বলেন, সমাজের বোঝা না হয়ে নয়নের নিজ উদ্যোগে কিছু করার চেষ্টা করাটাকে আমি স্যালুট জানাই। তার মাধ্যমে সব শিক্ষার্থী অনুপ্রাণিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.