যে কথা হয়নি বলা, তবুও মুশিকে মনে রাখবে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য দিনটি আজ অন্যরকম বিষাদের মনে হতেই পারে। মুশফিক ভক্ত কুলের জন্য তো বটেই। এভাবে হয়তো তার প্রস্থান কেউ চায় নি কিংবা তিনি নিজেও না। তবুও কিছু সময় বড্ড বেহায়া, মুহুর্তেই পর করে দেয় সব অর্জন। আর তাই আমরা অল্প ব্যর্থতার দায় চাপিয়ে সকল পেছনের অর্জনকে ভূলে গিয়ে বিসর্জন দেই আমাদের প্রাপ্তিকে। আর তাই হয়তো মুশি নিজেকেই সরিয়ে দিলেন বিশ্ব ক্রিকেটের জনপ্রিয় ফরম্যাট টি-২০ থেকে।

তার এই বিদায়ে এক এক করে ভাঙতে যাচ্ছে দেশের ক্রিকেটের শক্ত ভিত্তি পঞ্চপাণ্ডবের ঘর। এরই মধ্যে ভেঙে গেছে ঘরের তিন মজবুত খুঁটি। শুরুটা ম্যাশকে দিয়েই হয়, পুরো ক্রিকেট খেলা থেকেই যেন নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন বাংলাদেশের সফল অধিনায়ক ক্যাপ্টেন কুল মাশরাফি বিন মুর্তজা, তারপর টি-২০ থেকে আরেক দিকপালকে হারালো দেশের ক্রিকেট, তিনি তামিম ইকবাল খান। আর আজ মিস্টার ডিপেন্ডেবল মুশফিকুর রহিম। বাকি রইলেন কেবল রিয়াদ ও সাকিব। তারপর হয়তো তাদেরই ডাক পড়বে এমন বিদায় ঘন্টায়।

বিসিবির দায় আছে না নাই সেটা নিয়ে কিছু না বলাই ভালো। ক্রিকেট নিয়ে দেশের মানুষ হিসেবে আমরা বড্ড আবেগী। আর তাই তো সাকিব এশিয়া কাপ চলার সময় বলেই ফেললেন আবেগ নিয়ে নয় ক্রিকেট খেলতে হয় মাথা দিয়ে। আসলে মাঠের বাইরে থেকে আমরা বলতেই পারি অনেক কিছু্, কিন্তু মাঠের ভেতর মূলকাজটা করতে হয় ক্রিকেটারদেরই। তারপরও তাদের সফলতা-ব্যর্থতা চাপিয়ে মনকষ্টের একটা জায়গা তৈরিই হয়ে যায় ক্রিকেটারদের। যেখানে আসলে আমরা কেবলই প্রত্যাশা করি জয়। পরাজয় মেনে নিতে চাই না বা পারি না। তাই হয়তো মুশি আজ তার সামাজিক মাধ্যমে দেশবাসিকে সম্মানীত করেই বিদায় নিলেন টি-২০ ফরম্যাট থেকে।

এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত! রোববার দুপুরে হঠাৎ করেই নিজের ভেরিভায়েড ফেসবুক পেইজে একটি পোস্ট করলেন মুশফিক। যেখানে তিনি জানান, আন্তর্জাতিক টি-২০ থেকে অবসর নিয়েছেন। তার এ ঘোষণার পর মুহূর্তেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে ভক্তদের মাঝে। আজ দুপুরেই মুশি জানিয়ে দিলেন যে, এশিয়া কাপই ছিল তার শেষ টি-২০। বিদায় ঘোষণাতে মুশফিক লিখেন, সবাইকে সালাম এবং শুভেচ্ছা। দীর্ঘ ক্রিকেট ক্যারিয়ারের যাত্রায় আমি আপনাদের সবাইকে পাশে পেয়েছি। ভাল এবং খারাপ দুই সময়েই আপনাদের অকুন্ঠ সমর্থন আমার প্রেরণা।

টি-২০ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ার থেকে আজ আমি অবসর নিচ্ছি। তবে, বাংলাদেশের হয়ে টেস্ট এবং ওয়ানডে খেলা চালিয়ে যাবো। আশা করছি এই দুই ফরম্যাটে আমি আরো কিছু নিয়ে আসতে পারবো দেশের জন্য।

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) সহ অন্যান্য ফ্রেঞ্চাইজি লিগে আমি আমার খেলা চালিয়ে যাবো টি-২০ ফরম্যাটে। আলহামদুলিল্লাহ, সবার নিকট কৃতজ্ঞতা। ধন্যবাদ। আল্লাহ হাফেজ।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বলার কারণও ছিল যথেস্ট, সম্প্রতি এশিয়া কাপে বাজে পারফরম্যান্সের কারণে নানা রকম আলোচনা-সমালোচনায় পড়েন তিনি। আর তাই আন্তর্জাতিক টি-২০ থেকে অবসরের তার এ সিদ্ধান্ত নিলেন। তবে ওয়ানডে ও টেস্ট ক্রিকেট চালিয়ে যাবেন এই ক্রিকেটার।

মুশফিকের টি-২০ ক্যারিয়ার

দেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যাটার মুশফিকুর রহিম। দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে টি-২০ ফরম্যাটে মিডল অর্ডারে দলের ভরসার প্রতীক হয়ে ছিলেন। যতক্ষণ ক্রিজে ছিলেন, চেষ্টা করেছেন দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেওয়ার।

২০০৬ সালের ২৮ নভেম্বর খুলনায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মুশফিকের টি-২০ অভিষেক হয়। চলতি বছরের ১ সেপ্টেম্বর শ্রীলংকার বিপক্ষে ম্যাচের মাধ্যমে দীর্ঘ এই পথচলার সমাপ্তি ঘটে তার।

এ সময়ের মাঝে তিনি জাতীয় দলের হয়ে খেলে গেছেন ১০২ টি-২০ ম্যাচ। ১০২ ম্যাচের মাঝে ৯৩ বার মাঠে নেমেছেন মুশফিক। রান করেছেন ঠিক ১,৫০০। গড় ১৯.৪৮, স্ট্রাইক রেট ১১৫.০৩।

মোট ছয়বার অর্ধশতকের দেখা পেয়েছেন তিনি। এর মাঝে সর্বোচ্চ ইনিংসটি অপরাজিত ৭২ রানের। ১২৬ চারের সঙ্গে এই ফরম্যাটে তিনি ছক্কা হাঁকিয়েছেন ৩৭টি।

কিপার হিসেবেও দারুণ সফল ছিলে মুশফিক। সবমিলিয়ে ৪২ বার বল তালুবন্দী করেছেন তিনি, এছাড়া স্ট্যাম্পিংয়ে সফল হয়েছেন ৩০ বার। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে চতুর্থ সর্বোচ্চ ৬২ ডিসমিসালের রেকর্ড তার দখলে।

আন্তর্জাতিক টি-২০তে মুশফিকের অর্জন

অভিষেক থেকে শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ এই পথচলায় মুশি জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন ১০২ টি-২০। বাংলাদেশের হয়ে যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড।

১০২ ম্যাচের মাঝে ৯৩ বার মাঠে নেমেছেন মুশফিক। রান করেছেন ঠিক ১,৫০০। এটি দেশের হয়ে চতুর্থ সর্বোচ্চ। এর মাঝে সর্বোচ্চ ইনিংসটি অপরাজিত ৭২ রানের, ব্যক্তিগত ইনিংসের দিক থেকে যা দশম।

মুশফিকের ১৯.৪৮ গড় এখন পর্যন্ত দেশের ক্রিকেটারদের মাঝে ১১তম সেরা। ১১৫.০৩ স্ট্রাইক রেট নিয়ে এখানে তিনি আছেন ১২তম স্থানে। মোট ছয়বার অর্ধশতকের দেখা পেয়েছেন তিনি। দেশের হয়ে যা যৌথভাবে তৃতীয় সর্বোচ্চ।

৯৩ ইনিংসের মাঝে ৮ ইনিংসে রানের খাতা খোলার আগেই সাজঘরে ফিরেছেন মুশফিক। এটি বাংলাদেশিদের মাঝে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। সেরা স্থানে আছেন ১০টি ডাক মারা সৌম্য সরকার।

কিপার হিসেবেও দারুণ করেছেন মুশফিক। সবমিলিয়ে ৪২ বার বল তালুবন্দী করেছেন তিনি, এছাড়া স্ট্যাম্পিংয়ে সফল হয়েছেন ৩০ বার। দেশের ক্রিকেটে রেকর্ড ৬২ ডিসমিসালের মালিক তিনি।

বাংলাদেশকে ২৩ ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েছেন মুশফিক। যা তৃতীয় সর্বোচ্চ। কমপক্ষে দশ ম্যাচ নেতৃত্ব দেওয়া অধিনায়কদের মাঝে তার জয়ের হার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

যে বিশ্বরেকর্ডে সবার ওপরে মুশফিক

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি এমন একটি রেকর্ড রেখে অবসরে গেলেন, যা যে কোনো ক্রিকেটারের জন্যই গর্বের। আন্তর্জাতিক টি-২০তে সবচেয়ে লম্বা সময় জাতীয় দলের হয়ে খেলার রেকর্ড গড়ে অবসরে গেলেন মুশফিক।

সময়ের হিসেবে মুশফিক আন্তর্জাতিক টি-২০ খেলেছেন দীর্ঘ ১৫ বছর ২৭৭ দিন। যা অনন্য এক বিশ্বরেকর্ড।

অবশ্য এটি তার হাতে থাকছে আর মাত্র একদিন। কারণ তার সঙ্গেই যে আছেন সাকিব আল হাসান। দুজনেরই একই দিনে টি-২০ অভিষেক হয়েছিল। তবে অবসরের সময় পর্যন্ত তিনিই ছিলেন শীর্ষে।

মুশফিকের উদ্দেশ্যে রিয়াদ ও তামিমের যে বার্তা

মুশফিকের অবসরের এই সময়ে তার সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানিয়েছেন তারই মাঠ সতীর্থরা। নিজেদের সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেছেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও তামিম ইকবাল।

রোববার ৪ সেপ্টেম্বর দুপুর সোয়া ১২টার দিকে নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে অবসরের ঘোষণা দেন মুশফিক। এর ঘণ্টা দুয়েক পর মুশফিকের সঙ্গে নিজের একটি ছবি যোগ করে পোস্ট করেন রিয়াদ।

পোস্টে রিয়াদ লিখেন, প্রিয় মুশফিক, তোমার অবসরের ঘোষণা শুনে আমার হৃদয় ভেঙে গেছে। তবে টি-২০ ফরম্যাটে তোমার ক্যারিয়ার ও অর্জন যথেষ্ট ভালো ছিল। তোমার সঙ্গে টি-২০ খেলা আমার জন্য আনন্দদায়ক ছিল। তোমার কর্মযজ্ঞ সবধরণের ফরম্যাটেই অনুপ্রেরণার মতো।

মাহমুদউল্লাহ ছাড়াও অবসরের দিনে হৃদয়স্পর্শী এক বার্তা দিয়েছেন তার সতীর্থ ও জাতীয় দলের ওয়ানডে অধিনায়ক তামিম ইকবালও।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বন্ধু মুশফিককে উদ্দেশ্য করে শুরুতেই অভিনন্দন জানিয়ে তামিম লিখেন, ১৫ বছর ২৭৭ দিনের টি-২০ ক্যারিয়ার কোনো ফ্লুক নয়। বছরের পর বছর তোকে খুব কাছ থেকে দেখেছি।

এরপর তিনি লেখেন, পরিসংখ্যান সবসময় সবটুকু ফুটিয়ে তুলতে পারে না। কিন্তু তোর নিবেদন, প্যাশন, পরিশ্রম ও ভালোবাসা দেখেছি। তোর প্রচেষ্টা ও ঘাম ঝরানো দেখেছি। আন্তর্জাতিক টি-২০তে তোর যা কিছু অর্জন ও প্রাপ্তি, সব কিছুর জন্য অভিনন্দন আরও একবার…

পরিশেষে তামিম লিখেন, টেস্ট ও ওয়ানডেতে এখনও অনেক বড় ভূমিকা আছে তোর, দলকে দেওয়ার আছে আরও অনেক কিছু। আমি নিশ্চিত, তুই পারবি বন্ধু!

ভক্তদের প্রতিক্রিয়া

টি-২০ ফরম্যাট থেকে মুশফিকের বিদায়ী পোস্টে ভক্তদের থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন তিনি। মোটাদাগে বললে ভক্ত-সমর্থকদের প্রশংসায় ভাসছেন এই ক্রিকেটার।

অবসরের ঘোষণা দেওয়ার এক ঘণ্টার মাঝে তার সেই পোস্টে প্রায় সোয়া দুই লাখ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ভক্ত-সমর্থকরা।

যার মধ্যে দুঃখের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ৯৫ হাজারেরও বেশি ভক্ত। এছাড়াও ৫০ হাজারেরও বেশি ভক্ত ভালোবাসার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ৭০ হাজারেরও বেশি ভক্ত দিয়েছে লাইক রিয়্যাকশন। এই পোস্টে প্রায় ১০০ জন ভক্ত রাগের রিয়্যাকশনও দিয়েছে।

এদিকে মুশফিকের অবসর নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া পোস্টে কমেন্টস করেছেন প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ। যেখানে বেশিরভাগ ভক্ত-সমর্থকই শুভকামনা জানিয়েছেন এই ক্রিকেটারকে।

আন্তর্জাতিক টি-২০ ফরম্যাট থেকে বিদায় নিলেন বটে। খেলবেন ওয়ানডে আর টেস্টের লাল বলে। ক্রিকেটের ছোট পরিসর থেকে বিদায় নেয়ায় এতে করে তার কোনো ক্ষতি হবে কি না সেটা দেখার চাইতে ভাবতে হবে ক্রিকেট কি হারালো।

তবে কিছু হারাবেনা দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা বিসিবি, মুশফিকের জায়গায় হাল ধরবে অন্য কোনো ক্রিকেটার। কিন্তু দিন শেষে দেশ একজন ডিপেন্ডেবলকেই হারাবে এটাই সত্য। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, দেশকে প্রতিনিধিত্বকরে দীর্ঘদিন সার্ভিস দেয়া মুশফিকদের কি আমরা যথাস্ত সম্মানের সহিত বিদায় দিতে পারি না …?

Leave a Reply

Your email address will not be published.