২০১৬ সালের ১৪ জুন। চোখের সামনে মা পুড়ছিলেন। কিন্তু কিছুই করতে পারেননি দুই মেয়ে। কারণ বাইরে থেকে তালা দেওয়া ছিল। মায়ের সেই বাঁচার আকুতি, চিৎকার এখনো কানে বাজে তাদের।
হত্যাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয় স্থানীয় পুলিশ। একপর্যায়ে বড় বোন মা হত্যার বিচার চেয়ে নিজের রক্তে ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লেখেন। এরপর নড়ে বসে পুলিশ প্রশাসন। দীর্ঘ ছয় বছর পর অপরাধী দণ্ডিত হন।

বড় বোন লতিকা বলেন, ‘মায়ের চিৎকারে সকাল সাড়ে ছয়টায় ঘুম ভাঙে। কিন্তু আমরা কিছুতেই মাকে সাহায্য করতে পারছিলাম না। কারণ, আমাদের কক্ষের দরজা বাইরে থেকে তালা দেওয়া ছিল। চোখের সামনে মাকে দাউ দাউ করে জ্বলতে দেখলাম।’

লতিকা আরো বলেন, এ ঘটনার পর তারা স্থানীয় পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসকে ফোন দিলেও সাড়া মেলেনি। এরপর তারা তাদের মামা ও দাদিকে ফোন দেন। এ খবর পেয়ে দ্রুত তারা ছুটে আসেন এবং মাকে হাসপাতালে নিয়ে যান।

চিঠি লেখার সময় দুই বোনের বয়স তখন ১৫ ও ১১। বড় বোনটি এখন ২১ বছরের তরুণী। তার নাম লতিকা বানসালি। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে লতিকা ও তার ছোট বোনের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আদালত অপরাধীকে দণ্ডিত করে কারাগারে পাঠান। আর এই দণ্ডিত ব্যক্তি হলেন দুই বোনের বাবা।

লতিকার মায়ের ‘অপরাধ’ ছিল ছেলেসন্তান জন্ম দিতে না পারা। এ জন্য স্বামীর হাতে মার খাওয়া ছিল তার নিত্যদিনের ঘটনা। তবে লতিকার বাবা মনোজ বানসাল অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, তার স্ত্রী আত্মহত্যা করেছেন। গত বুধবার উত্তর প্রদেশ রাজ্যের বুলন্দশহর জেলা আদালত মনোজকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেন।

এই বিচারকাজ চলার সময় লতিকা ও তার বোন আদালতকে জানিয়েছেন, তারা কোন পরিবেশে, কীভাবে বেড়ে উঠেছেন। তারা দেখেছেন, কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার দায়ে তার মা অনু বানসালকে বাবা ও বাবার বাড়ির লোকজন কতটা কথা শুনিয়েছেন, কতটা নির্যাতন করেছেন। তার মাকে এক এক করে ছয়বার গর্ভপাত ঘটানো হয়েছে। সেগুলো ছিল কন্যা ভ্রূণ। চিকিৎসক জানান, অনু বানসালের শরীরের ৮০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। হাসপাতালে কয়েক দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তার মৃত্যু হয়।

দুই বোনের আইনজীবী সঞ্জয় শর্মা বলেন, চূড়ান্ত রায় পেতে ৬ বছর ১ মাস ১৩ দিন লেগেছে। কন্যারা নিজের বাবার বিরুদ্ধে মামলা চালিয়ে অবশেষে ন্যায়বিচার পেয়েছে, এটি একটি বিরল ঘটনা। ছয় বছরের বেশি সময়ে এই দুই বোন ১০০ বারের বেশি আদালতে হাজিরা দিয়েছেন, একটি তারিখও বাদ যায়নি।

আইনজীবী শর্মা বলেন, এ ঘটনায় তিনি কোনো ফি নেননি। তিনি এই সামাজিক সমস্যা নিয়ে মানুষকে সচেতন করতে মামলাটি লড়েছেন। ‘এটি শুধু একজন নারীকে হত্যা নয়, এটি সমাজের বিরুদ্ধে অপরাধ। সন্তান ছেলে না মেয়ে হবে, তা নির্ধারণ হওয়ার পেছনে নারীর হাত নেই, তাহলে তারা কেন নির্যাতিত হবে বা শাস্তি পাবে?’

Leave a Reply

Your email address will not be published.