পরিবেশের বন্ধু গাছ। যেখানে গাছপালা বেশি থাকে সেখানে পরিবেশ ভালো থাকে। আর, যেখানে পরিবেশ ভালো থাকে সেখানে মানুষও ভালো থাকে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশকে ভালো রাখতে ক্যাম্পাসেই ৩৬ হাজার গাছ লাগিয়েছেন বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ। বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠা হয়। প্রতিষ্ঠালগ্নে খা খা রোদ্দুর, শুন্য শুন্য মনে হলেও প্রতিষ্ঠার ১৪ বছরে ২০২২ সালে পরিণত হয়েছে গাছপালা সজ্জিত সুরভিত একটি উদ্যানে। ড. তুহিন ওয়াদুদের একান্ত প্রচেষ্টা এবং অন্যান্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও দেশের বিভিন্নস্থানের বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের সহযোগিতায় গোটা ক্যাম্পাস সবুজায়ন হয়েছে। ক্যাম্পাসে রয়েছে মোট ৩০০ এর অধিক প্রজাতির ৩৬ হাজার ফলজ, বনজ, ওষধি ও দুর্লভ প্রজাতির বিভিন্ন গাছ। যা দেশের অন্যকোনো বিশ্ববিদ্যালয়েও নেই। এসব গাছ ছায়া দিয়ে আগলে রেখেছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের, তেমনি প্রকৃতিতে ছড়াচ্ছে বিশুদ্ধ বাতাস।

ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, বাংলাদেশে নতুন যেসব বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে তার মধ্যে নান্দনিক সৌন্দর্য রয়েছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর ২০১৩ সাল পর্যন্ত দেখেছি ক্যাম্পাসে ছায়ায় দাঁড়ানোর কোনো জায়গা নেই। শিক্ষার্থীরা যে ক্লাসের ফাঁকে কোথাও বসবে এমন কোনো পরিবেশ ছিল না। তখন আমরা উদ্যোগ নিলাম ক্যাম্পাসকে সবুজায়ন করব। এরপর আমি হয়তো অগ্রভাগে থেকেছি। কিন্তু আমার সঙ্গে শিক্ষার্থীরা সব সময় সহযোগিতা করেছে। কয়েকজন কর্মচারীও আমাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছে। মোটকথা আমাদের সমন্বিত চেষ্টার ফলাফল আমাদের এই ক্যাম্পাসের ৩৬ হাজার গাছ।

আমরা যখন কাজ শুরু করেছিলাম তখন বুঝে উঠতে পারিনি এতটা কাজ করতে পারব কিনা। আমরা যখন ১ হাজার গাছ লাগাই তখন মনে হয়েছিল আমরা পরিচর্যা করতে পারব তো। আমাদের এই ক্যাম্পাসের গাছগুলো কোন না কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা দিয়েছে। আমরা তাদের থেকে সংগ্রহ করে গাছগুলো লাগিয়েছি। যখন গাছের সংখ্যা বেশি হয়েছিল তখন আমরা শ্রমিক দিয়ে গাছগুলো লাগিয়েছি। আমাদের সময়, শ্রম, অর্থ ও মেধার সমন্মিত প্রচেষ্টা হলো এই সবুজ ক্যাম্পাস। আমরা যে এই গাছগুলো লাগিয়েছি তা সংগ্রহ করার ইতিহাসও কম নয়। রাস্তার পাশ থেকে পেয়েছি। যে গাছ ডাল কেটে লাগাতে হয় তা কেটে লাগিয়েছি। যে গাছ সহজে পাওয়া যায় না তা যেখানেই দেখেছি সেখান থেকে এনে লাগিয়েছি। আমরা মনে করি সবুজের এই মনোরম দৃশ্য অন্য কোথাও নেই। সবুজের প্রতি যে মায়া তা ক্যাম্পাসে আসলে বোঝা যায়।

তিনি বলেন, বিরল প্রজাতির গাছের মধ্যে রয়েছে- আগর, ইটোরিয়া, উদাল, কইনার, কুম্ভী, কুরসি, কুসুম, কাইজেলিয়া, কাউফল, কাজুবাদাম, কানাইডিঙা, কেভেভুইয়া, গ্লিরিসিডিয়া, চাপালিশ, চালমুগরা, চিকরাশি, জঙলিবাদাম, জেকারান্ডা, ঝুমকাভাদি, ঝুমকোলতা, টিকচাম্বুল, ঢাকিজাম, তমাল, তালমুগরা, তুন, তেলসুর, নাগলিঙ্গম, নীলমণিলতা, পাদাউক, পানিয়াল, পালাম, পুত্রঞ্জীব (২), বনআশরা, বাজনা, বিজলঘণ্টা, বুদ্ধ নারিকেল, ভুঁইকদম, মণিমালা, মহুয়া, মাইলাম, রক্তন, রসকাউ, লকাট, লালসোনালু, লোহা, সিভিট, সিন্দুরী, সুন্দরী, সুলতান চাঁপা, অশোক, হলদু ও হিজলসহ অনেক গাছ। বাংলাদেশে আর কোথাও এক জায়গায় এতো গাছ পাওয়া যাবে না। এসব বিরল প্রজাতির গাছের অনেকগুলো হয়তো হারিয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের প্রত্যাশা এ বিশ্ববিদ্যালয়ে এত দুর্লভ ও বৈচিত্র্যময় গাছ থাকবে যা দেখে লোকজন বলবে এটি একটি বৃক্ষের জাদুঘর। বাংলাদেশের সকল প্রজাতির একটি করে গাছ যেদিন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবে, সেদিন আমাদের গাছ লাগানো শেষ হবে। আমরা এ বিশ্ববিদ্যালয়কে বৃক্ষের জাদুঘরে পরিণত করতে চাই।

ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা যায় মনোরম সৌন্দর্যের হাতছানি। সারি সারি পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানো হয়েছে। কৃষ্ণচূড়া, দেবদাড়ু, বকুল, হিজল গাছে ফুল ফুটে পুরো ক্যাম্পাসকে আরো সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে। এসব গাছে বাসা বেধেছে রং বেরঙ্গের নানান পাখি। পাখির মন জুড়ানো কল-কাকলি ধ্বনিতে পূর্ণ থাকে সারাক্ষণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক উমর ফারুক ঢাকা পোস্টকে বলেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠালগ্নে গাছপালাহীন ছিল। এরপর বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ এর প্রচেষ্টা ও অন্যান্যদের সহযোগিতায় অল্প সময়েই ক্যাম্পাসের রুপ বদলে গেছে।

সারাদেশে এই ক্যাম্পাসটি একটি সবুজ ক্যাম্পাস হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। আমি মনে করি এ সবুজায়ন প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। ক্যাম্পাসটি অনন্য রুপ নিয়ে ধরা দেবে এবং আমাদেরকে আরও মোহিত করবে। ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ওবাইদুল্লাহ বলেন, ক্যাম্পাসটি আমার খুবই ভালো লাগে। এখানে এলেই প্রকৃতির স্বাদ পাই। আমাদের সঙ্গে গাছগুলোর যেন সখ্যতা গড়ে উঠেছে। আমরা গাছের ছায়ায় বসি, গল্প করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ফয়সাল মাহবুব বলেন, আমার ভালো লাগার জায়গা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। তাই সুযোগ পেলেই ক্যাম্পাসে সময় কাটাই।

সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাদিম মাহমুদ বলেন, আমি ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ। যতবার ক্যাম্পাসে আসি ততবারই মুগ্ধ হই। সময় বদলের সঙ্গে ক্যাম্পাসের রুপও বদল হয়। ক্যাম্পাসটি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ফুল ফুটে নতুন রুপে সাজিয়ে তোলে। সৌজন্যে-ঢাকাপোষ্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published.