নূর মাহিম। বয়স চার বছর। এ বয়সেই মাকে হারিয়ে ফেলেছে চিরতরে। কিন্তু কোনোভাবেই ভুলতে পারছে না। মায়ের পরনের কাপড় দেখে দেখেই কাঁদছে শিশুটি। কষ্ট লাগে বলে নাতির কথায় এসব কাপড় লুকিয়ে রেখেছেন দাদি শামছুন্নাহার।
রোববার সকালে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নের মাইজপাড়া গ্রামে ট্রেনের ধাক্কায় বাসে থাকা মাহিমের মা রহিমা খাতুন মারা যান। এ ঘটনায় আরো তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৫ জন। নিহত রহিমা বরমী ইউনিয়নের বালিয়াপাড়া এলাকার জুলহাস উদ্দিনের স্ত্রী। মাহিম তাদের একমাত্র সন্তান। রোববার রাতেই আধা কিলোমিটার দূরে পুরোনো বাড়ির পাশে রহিমাকে কবর দেওয়া হয়।

রহিমা মারা যাওয়ায় স্বজনদের কান্নায় পুরো বাড়ির বাতাস ভারী হয়ে গেছে। কান্না থামছে না শিশু মাহিমেরও। তাই কোলে নিয়ে বাড়ির বাইরে হাঁটাহাঁটি করছেন বাবা জুলহাস উদ্দিন। বারান্দায় বসে পুত্রবধূর স্মৃতি মনে করছেন শ্বশুর নুরুল ইসলাম। সোমবার রহিমার বাড়িতে এমনই চিত্র দেখা গেছে। ছোট্ট মাহিম বলে, আমার আম্মা কপালে এখানে (নিজের কপালের বাঁ পাশ ছুঁয়ে) ব্যথা পেয়েছে। ব্যথা না পেলে আমাদের ছেড়ে চলে যেতো না। আম্মা অফিসে যাওয়ার গাড়িটাও একটি ট্রেন ভেঙে দিয়েছে। পরে বাড়ি লেগে আম্মা কপালে ব্যথা পেয়েছে। আম্মা প্রতিদিন যে কাপড় পরতো, সেগুলা দেখলে এখন খালি কান্দা আসে।

রহিমার স্বামী জুলহাস উদ্দিন বলেন, রহিমা খাতুনকে তারা প্রিয়া নামে ডাকতেন। প্রতিদিন সকাল ৭টায় কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হতেন তিনি। সকাল সাড়ে ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে তাকে ঘুম থেকে উঠতে হতো। বিছানায় ঘুমিয়ে থাকতো তাদের ছেলে নূর মাহিম। ছেলের কপালে চুমু দিয়ে সারা দিনের জন্য বিদায় নিতেন মা। কারখানায় কাজের সময় ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ। তাই মাঝে মধ্যে লুকিয়ে অন্য কারো ফোন থেকে সন্তানের খাওয়া-দাওয়ার খোঁজ নিতেন রহিমা। সন্ধ্যা হলে মায়ের ফেরার অপেক্ষায় থাকতো মাহিম।

জুলহাস বলেন, তাদের পুরো পরিবার কৃষিনির্ভর। এর মধ্যে বছরখানেক আগে জামান ফ্যাশনওয়্যার কারখানায় চাকরি নিয়েছিলেন রহিমা। নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ও সাংসারিক খরচে ভূমিকা রাখতেই তার চাকরিতে যোগ দেওয়া। তিনি আরো বলেন, তিনি নিজেও কুমিল্লায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। দুজনের যৌথ আয়ে সংসার মোটামুটি ভালোই চলতো। স্ত্রী মারা যাওয়ার খবর পেয়ে কুমিল্লা থেকে বিকেল নাগাদ বাড়ি আসেন তিনি।

রহিমার জা নাসিমা খাতুন বলেন, ভালোবেসে রহিমাকে বিয়ে করেছিলেন জুলহাস। বেশ ভালোই চলছিল তাদের সংসার। একমাত্র সন্তান নিয়ে সুখের সংসার তাদের। কিন্তু আকস্মিক সড়ক দুর্ঘটনায় সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.