গ্রিসের এক নৌবাহিনী সোনালি পশমের খোঁজে সমুদ্রযাত্রায় চলে যান। যাত্রা শুরু করেন আর্গো নামের এক জাহাজে চড়ে আয়োলকাস বন্দর থেকে। হারকিউলিস থেকে হাইলাস, দেশের নামকরা বীর যোদ্ধারা দল বেঁধে সঙ্গী হয়েছেন সেই রোমাঞ্চক সফরে। প্রথম কয়েকদিন সবকিছু

ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু পথের মধ্যে যে অজানা বিপদ লুকিয়ে আছে, তা কে জানবে! বিপদ বলে বিপদ! একেবারে মৃত্যুফাঁদ। জাহাজকে যে পথ
ধরে যেতে হবে সে পথেই যে পড়ে ‘সাইরেনাম স্কোপুলি’ দ্বীপপুঞ্জ। এই কুখ্যাত দ্বীপে সেসময় বাস করতো ‘সাইরেন’ নামের একদল রূপসী ডাইনি। আশ্চর্য সুরেলা কণ্ঠের অধিকারী এই ডাইনিরা। যুগে যুগে কত যে নাবিক তাদের গান শুনে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পাগলের মতো জাহাজ নিয়ে

ছুটে গেছে তাদের দ্বীপের দিকে, আর চরে পৌঁছনোর আগেই ডুবোপাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে জাহাজশুদ্ধ অক্কা পেয়েছে তার সীমা পরিসীমা নেই। এই দ্বীপের নাম শুনলেই তাই ভয়ে রক্ত হিম হয়ে যেত নাবিকদের।গ্রিসের এক নৌবাহিনী সোনালি পশমের খোঁজে সমুদ্রযাত্রায় চলে যান
গ্রিসের বীরেরাও পড়লেন মহা ফাঁপড়ে। শত্রু অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধে এলে নাহয় লড়া যায়। তবে সুরের সামনে কি আর অস্ত্র চলে! তাহলে উপায় কি?

খুব বেশি ভাবতে হলো না কাউকে, কারণ সেই অভিযাত্রী দলে ছিল এক অপরূপ তরুণ সদস্য। সুরের জাদুতে তাকে টেক্কা দেয়, এমন কেউ নেই ত্রিভুবনে। বিপদের কথা শোনামাত্র সে মুচকি হেসে কোলে তুলে নিল লাইর নামের এক আশ্চর্য বীণাযন্ত্র।
দ্বীপের কাছাকাছি জাহাজ আসামাত্র যুবকের চাঁপাকলির মতো আঙুলের আঘাতে বীণার তারে তারে বেজে উঠল স্বর্গীয় সুরের জাদু। সেই সুরের

আবেশে হারিয়ে গেল সাইরেনদের ছলনার গান, মুছে গেল একঘেয়ে সমুদ্রযাত্রার ক্লেশ। নির্বিঘ্নে সোনালি পশম অভিযান সেরে দেশে ফেরত এলেন বীর গ্রিক যোদ্ধারা। সুরের জাদুতে সব বিপদ কাটিয়ে হাসি মুখে দেশে ফিরে এলেন, সেই তরুণও, যার নাম অর্ফিয়ুস।
গ্রিক পুরাণের এক আশ্চর্য চরিত্র এই অর্ফিয়ুস। সুরের দেবতা বশ মেনেছিল তার কাছে। না হলে রক্তমাংসের মানুষ কী করে জন্ম দেবে অমন

অলৌকিক স্বর্গীয় সুরের! তার সুর শুনে থমকে যেত মানুষ, হিংসা ভুলে যেত বনের পশুরা, পাখিরা শিস দেওয়া ভুলে উড়ে আসত তার পায়ের কাছে। সে সুরের জাদুতে গাছে গাছে ফুল ফুটে উঠত, শিকড় ছিঁড়ে এগিয়ে আসতে চাইত গাছের দল।
গ্রিক শব্দ ‘অর্ফিয়ুস’-এর অর্থ অনাথ, বা যার পিতৃপরিচয় নেই, এমন কেউ। অর্ফিয়ুসকেও এক অর্থে অনাথই বলা যায়। তার বাবা ছিলেন

থ্রেসের রাজা ইগ্রাস। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অর্ফিয়ুস ছিল সঙ্গীত আর জ্ঞানের দেবতা অ্যাপোলোর সন্তান। আর তার মায়ের নাম ক্যালিওপি। সাহিত্য, সঙ্গীত, কলার দেবী যে নয় বোন, সেই মিউজদের অন্যতমা তিনি। এমন বাবা মায়ের ছেলে যে গানবাজনায় ওস্তাদ হবে- তাতে আর আশ্চর্য কী!গ্রিক ভাস্কর্য্যে অর্ফিয়ুসঅলিম্পাসের কাছাকাছি পিম্পলিয়া বলে এক নগরে জন্মেছিল অর্ফিয়ুস। সেখানেই মা-মাসিদের আদরে বেড়ে উঠেছে

সে। তারপর একটু বড় হতেই তার আশ্চর্য গুণের খবর রটে গেল দেশে বিদেশে। অর্ফিয়ুসের গান শুনে মানুষ পশুপাখি তো বটেই, মুগ্ধ হয়ে যেতেন স্বর্গের দেবতারাও। একবার তো গান গেয়ে দেবতাদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধই থামিয়ে দিয়েছিল অর্ফিয়ুস। ছেলে অর্ফিয়ুসকে খুব ভালোবাসতেন অ্যাপোলো। তিনিই প্রথম নিজের বীণা (মতান্তরে বাঁশি) লাইর বাজানো শেখান ছেলেকে। পরে খুশি হয়ে সেই বীণা উপহার হিসেবে তুলে দেন ছেলের হাতেই।

এ হেন অর্ফিয়ুস এক অনিন্দ্য-সুন্দরী রমণীর প্রেমে পড়ে। সে মেয়ের নাম ইউরিডিস। ইউরিডিসকে প্রথম দেখাতেই ভালো লেগেগেছিল অর্ফিয়ুসের। এই মেয়েকে না পেলে যেন তার জীবনই ব্যর্থ। ইউরিডিসির মন জয় করতে অর্ফিয়ুস জন্ম দেয় এক আশ্চর্য মায়াবী সুরের। সেই সুরে না-বলা সব কথা গেঁথে এমন এক গান গেয়ে শোনায়, যে গানে মুগ্ধ হবে না এমন পাষাণ কেউ নেই। ইউরিডিসও সে গান শুনে মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবেসে ফেলে অর্ফিয়ুসকে। দুজনে সিদ্ধান্ত নেয় বিয়ে করে আজীবন একসঙ্গে থাকবে তারা।

মহা ধুমধামে বিয়ে হয় অর্ফিয়ুস ও ইউরিডিসের। বিয়ের দেবতা হাইমেনাস তাদের আর্শিবাদ করলো। বিশাল উৎসব হলো। সবাই পেট ভরে খেলো বিয়ের ভোজ, পান করলো আকণ্ঠ সোমরস। নাচগানও হলো প্রচুর। তারপর রাত গভীর হলে অতিথিরা যে যার মতো ফিরে গেল একে একে। অতিথিদের বিদায় জানিয়ে বাড়ি ফিরছিল অর্ফিয়ুস আর ইউরিডিস।ইউরিডিসির মন জয় করতে অর্ফিয়ুস জন্ম দেয় এক আশ্চর্য মায়াবী সুরের

নতুন সংসার পাততে চলেছে তারা, দুচোখ ভর্তি সেই স্বপ্ন নিয়ে একে অন্যের হাত ধরে পথ চলছিল দুজনে। তারা জানতো না ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে আছে সাক্ষাৎ শমন, এরিস্তায়াস। এই মেষপালক দীর্ঘদিন ধরে গোপনে ভালোবাসতো রূপসী ইউরিডিসিকে। প্রেমিকা ইউরিডিসের মন পেল অর্ফিয়ুস, এ ঘটনা মেনে নিতে পারেনি সে। রাগে ঈর্ষায় জ্বলে নিয়েছে চরম সিদ্ধান্ত। ঠিক করেছে ইউরিডিসের সঙ্গে মিলনের আগেই নিকেশ করবে পথের কাঁটা অর্ফিয়ুসকে। তারপর তার সুন্দরী বউকে হরণ করে পালাবে। সেই মতো একটি ধারালো ছুরি নিয়ে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এরিস্তায়াস।

ছুরি নিয়ে এরিস্তায়াস ছুটে আসতেই ভয় পেয়ে গেল অর্ফিয়ুস। সে তো শিল্পী, যোদ্ধা নয়। লড়াই করতে শেখেনি সে। ভয় পেয়ে ইউরিডিসের হাত ধরে দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছুটতে লাগল অর্ফিয়ুস। ইউরিডিসি আর নিজেকে বাঁচাতে দৌড়াতে লাগল অন্ধকার অরণ্যের ভেতর দিয়ে। জোছনাও ঢুকতে পারে না সেই জঙ্গলে, এমন অন্ধকার। অন্ধকারে বেসামাল হয়ে ছুটতে গিয়ে হঠাৎ পা ফসকে ইউরিডিস পড়ে যায় এক সাপের গর্তে। তার পায়ের আঘাতে ব্যথা পায় সাপের বাচ্চারা। মা সাপ রেগে গিয়ে দংশন করে বসে ইউরিডিসকে। সাপের বিষে নীল হয়ে সেই জঙ্গলেই ছটফট করে মারা যায় ইউরিডিস। অর্ফিয়ুস আর ইউরিডিস

তবে অর্ফিয়ুস আর ইউরিডিসের প্রেমের গল্পে এখানেই ইতি নয়। ইউরিডিসের অকাল মৃত্যুতে শোকে পাগল হয়ে যায় অর্ফিয়ুস। লাইর থেকে সুরের বদলে ঝরতে থাকে অশ্রু। সেই বিষণ্ণ সুর শুনে গুমরে ওঠে পৃথিবী। কাঁদতে থাকে আকাশ। আকাশের ওপারে স্বর্গের দেবতারাও কেঁদে ফেলেন সে সুর শুনে। ইউরিডিসকে ছাড়া কী করবে, কোথায় যাবে বুঝতে না পেরে একা নিঃসঙ্গ অর্ফিয়ুস ঘুরতে থাকে এ দেশ, সে দেশ।

এভাবে ঘুরতে ঘুরতে একসময় সে চলে আসে অলিম্পাস পর্বতের উপর। তার কণ্ঠনিঃসৃত হাহাকার শুনে কেঁদে ওঠে দেবরাজ জুপিটারের মন। অর্ফিয়ুসকে তিনি বলেন সোজা যমলোকে প্লুটোর কাছে যেতে। পরলোকের দেবতা প্লুটো। একমাত্র তিনি তুষ্ট হলে আবার প্রাণ ফিরিয়ে দিতে পারেন ইউরিডিসের। পাশাপাশি দেবরাজ এ কথাও জানিয়ে দিলেন, নরকের পথে যাওয়া বড় সোজা কাজ নয়। সেই ভয়ংকর পথে পা বাড়ালে জীবন নিয়ে ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব। তাই সবদিক ভেবে যেন সিদ্ধান্ত নেয় অর্ফিয়ুস।

ইউরিডিসকে হারিয়ে জীবনের প্রতি সব মায়া ফুরিয়ে ফেলেছিল অর্ফিয়ুস। সে নির্ভয়ে বীণা বাজাতে বাজাতে চলল পাতালের দিকে। পাতালের সিংহদ্বারে পাহারা দেয় এক তিন মাথাওয়ালা ভয়ঙ্কর কুকুর, নাম সারবেরাস। অর্ফিয়ুসকে এগিয়ে আসতে দেখে রাগে তার মুখ দিয়ে বিষাক্ত আগুন ছিটকে উঠল। তবে অর্ফিয়ুসের বীণার সুর কানে যাওয়ামাত্র শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল সে। অর্ফিয়ুসকে কেউ বাধা দিল না।নরকে অর্ফিউস

অবাধে পাতালপুরীতে প্রবেশ করল সে। তার হাতে সেই অমৃতসুরের বীণা, যা থেকে চলকে উঠছে বিষাদের গান। নরকের অন্ধকার ভেদ করে সে সুর চলে গেল সপ্তপাতাল অবধি। ছুটে এলেন পাতালরাজ হেইডিস (প্লুটো) সঙ্গে তার রানি পারসেফোনি। সব শুনে এক শর্ত রাখলেন রাজা। বললেন, শুনেছি তুমি নাকি খুব ভালো গান করো। গানে যদি তুমি আমাদের মুগ্ধ করতে পারো তবেই ফিরে পাবে তোমার প্রিয়তমা ইউরিডিসির প্রাণ।

রাজি হলেন অর্ফিয়ুস। লাইর তুলে নিলেন আবার। সে সুর শুনে থেমে গেল যমদূতের হুঙ্কার আর পাপীদের চিৎকার। পানির মধ্যে আকণ্ঠ ডুবে থাকা ট্যান্টেলাস, জলতেষ্টায় যুগ যুগ ধরে পাগল সে বীণাধ্বনি ভুলিয়ে দিল তার জন্মজন্মান্তরের তৃষ্ণা। থেমে গেল নরকের চক্র। ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত মহাপাপী ইক্সিয়ন এই প্রথম বিশ্রাম পেল।

আজন্মের শাস্তি ভুলে পাথরে হাত রেখে দুদণ্ড জিরিয়ে নিল সিসিফাস। অর্ফিয়ুসের বীণার সুরে নরকে তখন তুলকালাম শুরু হয়েছে। সে গান শুনে কেঁদে ফেললেন রানি পারসেফোনি। ভিজে এল নরকের রাজার চোখও। ইউরিডিসির প্রাণ ফিরিয়ে দিতে সম্মত হলেন প্লুটো। তবে শর্ত দিলেন- সূর্যের আলো ইউরিডিসির শরীরে না পড়া পর্যন্ত সে ইউরিডিসির দিকে তাকাতে পারবে না। সে শর্ত মেনে নিয়ে খুশি মনে ইউরিডিসিকে নিয়ে ফিরে চললো অর্ফিয়ুস।ছুরি নিয়ে এরিস্তায়াস ছুটে আসতেই ভয় পেয়ে গেল অর্ফিয়ুস

মনের আনন্দে বীণা বাজিয়ে পথ চলছেন অর্ফিয়ুস, পিছনে ইউরিডিস। যমপুরীর সীমানা পেরিয়ে সূর্যের আলো দেখামাত্র আনন্দে পাগল হলেন অর্ফিয়ুস। পথ আর বেশি বাকি নেই, অন্ধকার মিলিয়ে মর্ত্যলোকের আলো দেখা যাচ্ছে, ঠিক এসময় দেবতাদের সতর্ক বাণী অগ্রাহ্য করে পিছনে ফিরে তাকাল অর্ফিয়ুস। হাত বাড়াল ইউরিডিসকে ছোঁয়ার জন্য। কিন্তু সূর্যের আলো তখনো ইউরিডিসের গায়ে লাগেনি। ছোট একটি ভুল। ফল হল মারাত্মক। অর্ফিয়ুসের চোখের সম্মুখেই ইউরিডিসের অপূর্বসুন্দর মূর্তি মুহূর্তে মিলিয়ে গেল নরকের অন্ধকারে। কান্নায় ভেঙে পড়লেন অসহায় প্রেমিক অর্ফিয়ুস।

পাগলপ্রায় হয়ে সে আবার ফেরত যেতে চাইল নরকে। কিন্তু জীবন্ত কাউকে দেবতারা দ্বিতীয়বার নরকে ঢুকতে দিতে পারেন না। একাই পৃথিবীতে ফিরে যেতে বাধ্য হল অর্ফিয়ুস। বিষণ্ণতায় ডুবে ততদিনে মানুষের সাহচর্য ত্যাগ করেছে সে। দেবতাদের শত অনুরোধেও স্বর্গে যেতে রাজি হইয়নি। সুরই তখন তার একমাত্র সঙ্গী। লাইর হাতে একা একা সে ঘুরে বেড়াত থ্রেসের দুর্গম সব অঞ্চলে। তার সুরের একমাত্র শ্রোতা ছিল প্রকৃতি, গাছপালা, পর্বতমালা। তার মনে হল আকাশে বাতাসে, গাছের পাতায় পাতায় ধ্বনিত হচ্ছে ইউরিডিসের নাম।দ্বিতীয়বার ফেরা যায় না নরকে

এমনই অস্থিরমনে ঘুরতে ঘুরতে একদিন তার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় মদের দেবতা ব্যাকাসের সঙ্গীসাথিদের। তারা চেপে ধরে অর্ফিয়ুসকে। বলে, আমরা নাচব, তুমি বীণা বাজাও। কিন্তু অর্ফিয়ুসের মনে যে আনন্দ নেই। তার বীণার তারেও বাজল শুধুই দুঃখের সুর। হিতাহিতজ্ঞানশূন্য মাতালেরা রাগের চোটে ঝাঁপিয়ে পড়ল নিরস্ত্র অর্ফিয়ুসের শরীরে। তাকে মেরে, তার শরীর ছিন্নভিন্ন করে নদীর পানিতে ভাসিয়ে দিল। ভেঙে ফেলল তার বীণা লাইর। সেই দেহ ইউরিডিসের নাম উচ্চারণ করতে করতে ভেসে গেল কে জানে কোথায়! মৃত্যু পেরিয়ে অর্ফিয়ুস কি সত্যিই খুঁজে পেল তার আদরের ইউরিডিসকে? না কি চিরবিরহের গানেই শেষ হলো এই অমর প্রেমগাথা?

Leave a Reply

Your email address will not be published.