১০ বছরের জান্নাত ও সাত বছর বয়সী এবাদত। বাবা-মা-বোনকে হারিয়ে অনেকটাই নির্বাক তারা। চোখে কেবল ভাসছে বাবা-মায়ের চেহারা। কিন্তু বসতঘরের পেছনে কবরে চিরনিদ্রায় শুয়ে থাকা বাবা-মাকে আর দেখতে পাবে না তারা। তাইতো মা-বাবার কথা মনে পড়তেই ক্ষণে ক্ষণে ঝরছে তাদের চোখের পানি। শনিবার বিকেল পৌনে ৩টার দিকে সড়ক দুর্ঘটনায় মায়ের মৃত্যুর সময় পেট ফেটে জন্ম নেয়া ছোট্ট শিশু এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রোববার দুপুর ২টার দিকে ময়মনসিংহ নগরের চরপাড়া মোড়ের লাবীব প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সেই ছোট্ট বোনটিকে দেখতে যায় জান্নাত ও এবাদত। সব হারিয়েও বোনকে কাছে পেয়ে শোকের মাঝেই এক চিলতে হাসি ফুটেছে ভাই-বোনের মুখে।

যদিও তারা মা-বাবা ও এক বোনকে হারানোর যন্ত্রণা এখনো ঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারছে না, তারপরেও ফুটফুটে ছোট্ট বোনকে দেখতে গেছে। কারণ ছোট্ট শিশুটির আপন বলতে এখন তার বড়বোন জান্নাত ও বড়ভাই এবাদত। চতুর্থ শ্রেণি পড়ুয়া জান্নাত জানায়, সে তার বোনকে লালন-পালন করবে। তার কাছে রাখবে। কারো কাছে যেতে দেবে না। বোনকে দেখতে পেয়ে আনন্দিত ভাই এবাদতও। ছোট্ট বোনটি কখন বাড়ি ফিরবে সেই অপেক্ষার প্রহর গুনছে এবাদত।

লাবীব হাসপাতালের সেবিকা শরিফা আক্তার জানান, নবজাতক বোনের পাশে কিছু সময় ছিল তার ভাই-বোন। এ সময় তাদের আনন্দিত দেখা গেছে। তারা বোনকে কোলে নিয়ে আদরও করেছে। জান্নাত ও এবাদতের দাদা মোস্তাফিজুর রহমান বাবলু বলেন, বাবা-মা মারা গেছে এটি জান্নাত বুঝলেও এবাদত বুঝতে পারছে না। তাকে অনেক বুঝিয়ে শান্ত রাখা হচ্ছে। এর আগে শনিবার বিকেল পৌনে ৩টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ত্রিশালের কোর্টভবন এলাকায় রাস্তা পার হওয়ার সময় ট্রাকচাপায় প্রাণ হারান অন্তঃসত্ত্বা রত্না বেগম, তার স্বামী জাহাঙ্গীর আলম এবং তাদের ছয় বছরের মেয়ে সানজিদা।

প্রসবের নির্ধারিত সময় অতিক্রম হওয়ায় আলট্রাসনোগ্রাম করানোর জন্য স্থানীয় একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়েছিলেন তারা। সেখান থেকে ফেরার পথে ট্রাকচাপায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন তারা। তবে এ সময় অলৌকিকভাবে মায়ের গর্ভ ফেটে ভূমিষ্ঠ হয় ফুটফুটে এক নবজাতক। জন্ম নিয়ে রাস্তায় পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যায় পুলিশ ও আশপাশের লোকজন। পরে নবজাতকটিকে উদ্ধার করে নেওয়া হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে নেওয়ার পরই জানা যায় জীবিত আছে শিশুটি।

প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য নবজাতকটিকে ময়মনসিংহ সদরের সিবিএমসি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে এক্স-রে রিপোর্টে জানা যায় তার ডান হাতের দুইটি হাড় ভেঙে গেছে। বর্তমানে শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. কামরুজ্জামানের তত্ত্বাবধানে নগরীর লাবীব হাসপাতালে শিশুটি চিকিৎসাধীন রয়েছে। শিশুটি শঙ্কামুক্ত আছে এবং আগামী ১০-১৫ দিনের মধ্যে ভাঙা হাড় জোড়া লাগাসহ পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.