হাওরাঞ্চল যেন কূলহীন সাগর। দ্বীপের মতো ভেসে আছে চারপাশের গ্রাম। এখানে জীবন কাটছে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত অনেক শিশুদের। হাওরে বসবাসরত সাধারণ পরিবারের শিশুসহ বেদেপল্লির অনেক শিশুই শিক্ষা থেকে পিছিয়ে রয়েছে এখানে।

একদিন কিশোরগঞ্জ হাওরাঞ্চলের বাসিন্দা মোজাহিদুলের নজর পড়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের দিকে। ইচ্ছে হয় শিশুদের জন্য কিছু একটু করার। ২০২০ সালের দিকে প্রথম মাঠে নামেন তিনি। কিন্তু প্রথম দিকে তেমন একটা সমর্থন পাননি। কিন্তু পরে আর সেই ইচ্ছেটা নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখলেন না। কাছের বন্ধু মাহমুদ, নাসিফ, ফাহমিদা, ইফতিদের জানালেন তার ইচ্ছের কথা। সেই তালিকায় যোগ হয় আরো কিছু বন্ধু। রানা, রাহুল, নিবিড়, আরাফ, সাদ, মাহদী, ফাওজান ও আদনান সম্মতি দেয়।

সবার ইচ্ছায় কিশোরগঞ্জ শহরে যাত্রা শুরু করে একটি স্বেচ্ছাসেবক দল। নাম রাখা হয় ‘কিশোরগঞ্জ ভলান্টিয়ার্স’। কিশোরগঞ্জ ভলান্টিয়ার্স সদস্যরা একটু ভিন্নভাবে ভাবলেন, সবাই স্কুলে যাচ্ছে, স্কুলে যেতে পারছে না শুধু বেদেপল্লির শিশুরা। তাদের কথা চিন্তা করে গড়ে তুললেন ‘বেদে পল্লির পাঠশালা’ নামে একটি ভ্রাম্যমাণ পাঠশালা। সেখানে বেদে শিশুদের পড়ালেখা করাতে শুরু করে দিলেন নিজেরাই। নৌকায় বসেই চলে তাদের পাঠদান কার্যক্রম। এ যেন ভাসতে ভাসতে ভাসমান শিশুদের শিক্ষ‍া দেয়ার এক মহৎ আয়োজন।

শুধু এতটুকুতেই তাদের কার্যক্রম থেমে থাকেনি। কিশোরগঞ্জ ভলান্টিয়ার্সের সদস্যরা চিন্তা করলেন, ইটনা- অষ্টগ্রাম- মিঠামইন অলওয়েদার সড়ক চালু হওয়ার পর দ্রুতগতিতে যানবাহন চলাচলের ফলে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। জনসচেতনতা সৃষ্টি ও সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে তারা স্থাপন করেছে সতর্কতা ব্যানার। পাশাপাশি পর্যটক ও গাড়ির ড্রাইভারদের হাতে তুলে দেয় সতর্কতামূলক লিফলেট।

কিশোরগঞ্জ ভলান্টিয়ার্সের কার্যক্রম যেন নতুন মাত্রা পেল ২০২১ সালে। করোনা মহামারি পুরো দমে চলছে। মানুষ ঘরবন্দী হয়ে পড়ল। হাওরাঞ্চললের মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টিতে লিফলেট, মাক্স, হ্যান্ড স‍্যানিটাইজার বিতরণ করা হলো। শুরু হলো নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে পাশে দাঁড়ানোর কাজ।

হাওরের শিশুদের শিক্ষা ও সুরক্ষিত শৈশবের জন্য দরিদ্র ও মেধাবী শিশুদের মধ্যে টাকা, বিনামূল্যে খাতা কলম ও নতুন পোশাক উপহার দেওয়া হয়। এছাড়া সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য বিনামূল্যে মেডিকেল ক্যাম্প, ওষুধ বিতরণ, শীতবস্ত্র বিতরণ, বৃক্ষরোপন, বাল্যবিবাহ রোধ, শিশুশ্রম বন্ধে কাজ করছে কিশোরগঞ্জ ভলান্টিয়ার্স।

হাওরের নারীদের সাবলম্বী করতে স্বপ্ন টেইলার্স গড়ে তোলা হয়েছে। কিশোরগঞ্জ ভলান্টিয়ার্স থেকে সেলাই মেশিন দেওয়া হয়েছে। যার মাধ্যমে নারীরা প্রশিক্ষণ নিয়ে আত্মকর্মসংস্থান গড়ে তুলতে পেরেছে অনেকেই।

স্বেচ্ছাসেবক দলের উদ্যেক্তা মোজাহিদুল জানান, সদস্যরা সবাই শিক্ষার্থী। টিফিনের ও টিউশনির টাকায় সামাজিক কাজগুলো করছে। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবীরা মিলে হাওরে ভুট্টা চাষ করে। ভুট্টা বিক্রির টাকা সংগঠনের কার্যক্রমে ব্যায় করা হয়। আমরা আমোদের এমন কার্যক্রম অব্যহত রাখতে চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published.