মহামারি করোনা ভাইরাসে প্রকোপরোধে দীর্ঘ দেড় বছর দেশব্যাপি স্কুল বন্ধ থাকায় বাল্য বিয়ের শিকার হয়েছে অনেক শিক্ষার্থী। এ বাল্য বিয়ের কবলে পড়েছে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার চরাঞ্চলের বিদ্যাপিঠ হুগড়া হাবিব কাদের উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও।
স্কুলটির প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থীই হয়েছে বাল্য বিয়ের শিকার। সংসারের অভাব অনটনের ফলেই স্কুলের শিক্ষার্থীরা বাল্য বিয়ের শিকার হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

জানা যায়, ১৯৮৯ সালে স্থাপিত হয় হুগড়া হাবিব কাদের উচ্চ বিদ্যালয়। এর প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা আকরাম হোসেন। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত এ বিদ্যালয়টির বর্তমান শিক্ষার্থী সংখ্যা ১ হাজার ৫৫৬ জন। এছাড়াও এসএসপি পরীক্ষার্থী হিসেবে ফরম পূরণ করেছে ৩৫৯ জন।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে বিদ্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, এই বিদ্যালয়ে এসএসপি পরীক্ষার্থী হিসেবে ফরম পূরণ করেছে ৩৫৯ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী স্কুলে উপস্থিত হলেও বাকিরা অনুপস্থিত।

সরকারি নির্দেশনায় পরিক্ষার্থীদের ক্লাস নেয়াসহ বোর্ডে এ্যাসাইমেন্ট নম্বর পাঠানোর কারণে ছাত্রীদের বিয়ের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন তারা। এছাড়াও উপস্থিত ছাত্রীদের মাধ্যমে তারা জানতে পারছেন অনুপস্থিত ছাত্রীদের বিয়ের বিষয়টিও।

হুগড়া ইউনিয়ন বিবাহ রেজিস্ট্রার কাজী আবুল হাসেম বলেন, দরিদ্র ও চরাঞ্চলের গ্রাম এই হুগড়া। এ কারণে গ্রামের হাবিব কাদের উচ্চ বিদ্যালয়সহ অনেক স্কুল ছাত্রীর বাল্য বিয়ে হয়েছে বলে তথ্য পেয়েছেন তিনি। তবে ওই বিয়ে গুলো তাদের মাধ্যমে হয়নি। বাল্য বিয়ের শিকার ছাত্রীদের পরিবার বিভিন্ন এলাকার কাজী দিয়ে ওই বিয়ে সম্পন্ন করেছেন। এছাড়াও অনেকে আবার রেজিস্ট্রি ছাড়াই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন বলেও তথ্য পেয়েছেন তিনি।

হাবিব কাদের উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামীম আল মামুন জুয়েল বলেন, স্কুলে মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ১ হাজার ৫৫৬ জন। এর মধ্যে ছাত্রী ৬৯০ জন। তবে বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী উপস্থিতির সংখ্যা কিছুটা কমেছে। এসএসসি পরীক্ষার জন্য বিদ্যালয়ের ৩৫৯ জন ফমর পূরণ হয়েছে। এর মধ্যে সব বিষয়ে উত্তীর্ণ ২৬৫ আর এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯৪ জন। বর্তমানে উপস্থিতির হার প্রায় ৭০-৮০ ভাগ। এসব অনুপস্থিত ছাত্রীর মধ্যে প্রায় ৬০ জনের বিয়ে হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৩০ জন ছাত্র পরিবারের অভাব মেটাতে বিভিন্ন স্থানে কাজ করছে।

ইউপির বয়ড়া গ্রামের এক অভিভাবক বলেন, আমরা খুবই দরিদ্র। কৃষিকাজ করে সংসার চালাই। এ কাজ করে মেয়ের লেখাপড়া চালানো খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে। এছাড়াও মেয়েটি বড় হয়ে যাচ্ছে বলেই প্রবাসী এক পাত্রের কাছে মেয়ের বিয়ে দিয়েছি।

হুগড়া ইউপির ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. মিন্টু মিয়া বলেন, গ্রামগুলোতে অতি গোপনীয়তার সঙ্গে বাল্য বিয়ে দেয়া হয়। এ কারণে বাল্য বিয়ের কোনো তথ্যই জানেন না তারা। তবে এরইমধ্যে আনাহলা স্কুলের এক ছাত্রীর বিয়ে হয়েছে বলে জানান তিনি।

হুগড়া ইউপি চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন খান তোফা বলেন, করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে দীর্ঘ দেড় বছর ব্যস্ত ছিলাম। স্কুল বন্ধ থাকাসহ অভাব অনটনে অনেক অসচেতন অভিভাবক তাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন বলে জানতে পেরেছি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে ওই বিয়ে গুলো ঠেকানো যেত বলে মনে করেন তিনি।

মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান আজাদ বলেন, বাল্যবিয়ে আইনের পরিপন্থী। করোনাকালীন সময়ে এই বাল্যবিয়ের প্রবণতা অনেকটাই বেড়ে গেছে। দারিদ্রতার কারণে গ্রামাঞ্চলের অনেক পরিবারই তাদের স্কুল পড়ুয়া মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন।

এ সময়ে জেলার অধিকাংশ স্কুলেই ছাত্রী বিয়ের ঘটনা ঘটেছে। করোনার সংক্রমণ ভয়াবহভাবে বেড়ে যাওয়া প্রশাসনসহ তারা এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারিনি বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা লায়লা খানম এর মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *